রামপুরহাটের ইতিহাস সম্পর্কে আর একটি মূল্যবান আলোচনাটি লিখেছেন ড. চৈতন্য বিশ্বাস, রীডার এবং প্রধান অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, হীরালাল ভকত কলেজ, বীরভূম

এক কথায় অসাধারণ ভালো এবং প্রয়োজনীয় একটা গ্রন্থ শ্যামচাঁদ বাগদির লেখা রামপুরহাটের ইতিহাসএই গবেষণামূলক গ্রন্থটি রামপুরহাট এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলির শিক্ষিত মানুষদের কাছে অবশ্যই বেশ আদরণীয় হবেগ্রন্থটিতে কী আঠে, না বলে এক কথায় বলা ভালো গ্রন্থটিতে কী নেইরামপুরহাট সম্পর্কিত বহু তথ্যের সন্ধান এবং বহু প্রশ্নের মীমাংসা পাওয়া যাবে এই গ্রন্থের মাধ্যমেরামপুরহাটের প্রাচীন ইতিহাস, এর ভৌগোলিক অবস্থান, নামকরণ, প্রাচীন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় অবস্থান, জনবসতি, শাসন ব্যবস্থা, বিবর্তন, নগরায়ণ, হাট-বাজার স্থাপন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধি, স্কুল-কলেজ স্থাপন, স্টেশন, বাসস্টপেজ স্থাপন ও অন্যান্য নানা দিক থেকে রামপুরহাটের উন্নয়ণ ও সমৃদ্ধি---- সকল বিষয়েই প্রাথমিক কৌতুহল মেটানো যায় এই গ্রন্থের মাধ্যমেলেখক শ্যামচাঁদ বাগদি একজন গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে রামপুরহাট  অঞ্চলের সকল বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেনশ্যামচাঁদ বাবুর দীর্ঘদিনের নিরলস চেষ্টায় বিভিন্ন বিষয়ের বহু তথ্য উঠে এসেছে এ গ্রন্থেশুধু রামপুরহাট নয়, পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ বহু এলাকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে এ গ্রন্থেহিন্দুধর্মের পাশা-পাশি বৌদ্ধ, জৈন, মুসলিম ধর্ম এখানে কখন, কেমন গুরুত্ব পেয়েছে, কেনই বা তাদের গুরুত্ব লোপ পেয়েছে, সে কথাও আলোচিত হয়েছেআলোচিত হয়েছে মন্দির-মসজিদের কথাও, বিশেষ করে তারাপীঠের তারা মা, পঞ্চপীঠের গুরুত্ব, তারাপীঠের মহাশ্মশান, নাটোরের রাজ-পরিবারের কথা, তারাপীঠের ভৈরব বামদেবের কথা গুরুত্ব পেয়েছেরামপুরহাটের গুরুত্বপূর্ণ পাড়াগুলোর কথা, বিভিন্ন পাড়ার নামকরণের ইতিহাস এবং গুরুত্বও আলোচিত হয়েছে গ্রন্থেকোন পাড়ার কী বিশেষত্ব তাও জানাবার চেষ্টা হয়েছে এ গ্রন্থেমহাজন পট্টী, কামার পট্টী, ভাড়শালা পাড়া, সানঘাটা পাড়া, ধোবা পাড়া, রেলপাড়, চালধোওয়ানী পাড়া----এই রকম পাড়াগুলো নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশনের চেষ্টা হয়েছেপাড়া হয়তো আরও অনেক আছে, তবে কয়েকটি পাড়ার কথা বিশদে জানানো হয়েছেজানানো হয়েছে রামপুরহাটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কেওযেমন---রেলওয়ে ইনস্টিটিউট, কোর্ট, হাসপাতাল, পৌরসভা, কলেজ, পৌরমঞ্চ, মহকুমা লাইব্রেরী, রেলওয়ে ইনস্টিটিউট লাইব্রেরী ইত্যাদির কথাএই সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিকাশ ঘটেছে রামপুরহাটের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতারআজ আমরা রামপুরহাটকে যে অবস্থায় দেখছি, তা বহুদিনের বিবর্তনের ফলএকদিন এই রামপুরহাটেরও দৈন্যদশা ছিলব্রিটিশ শাসনের সময় এখানকার মানুষকেও শাসন, শোষন, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছেগান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে সামিল হয়েছেন তখনকার রামপুরহাটের মানুষেরাসাঁওতাল বিদ্রোহেও ভূমিকা ছিল রামপুরহাটের1946 সালে মহাত্মা গান্ধী যে রামপুরহাটে এসে বক্তৃতা করেছেন, সে তথ্যও রয়েছে এ গ্রন্থেছিয়াত্তরের মণ্বন্তর, দুর্ভিক্ষ, অন্নাভাবে মানুষের মৃত্যু---এইসব ঘটনার সময় রামপুরহাটও ভালো ছিল নাখরা-বন্যায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কথা এ গ্রন্থেও উল্লেখ করা হয়েছেতবে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে, এলাকার মানুষের চেষ্টায় রামপুরহাট যে আজ মহকুমা শহর হয়ে উঠেছে, শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে, তার পরিচয়ও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে এই গ্রন্থেপুজা, ধর্মচর্চা, মেলা, উত্সব, বইমেলা, নৃত্য, গীত, নাটক, যাত্রা, সাহিত্য চর্চা, সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদি সকল রকম সংস্কৃতি চর্চার কথাও সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে এই গ্রন্থেকাজেই, বলা যেতেই পারে, রামপুরহাটের ইতিহাস জানতে হলে, রামপুরহাটকে জানতে হলে শ্যামচাঁদ বাগদির লেখা রামপুরহাটের ইতিহাস কে ভরসা করতেই হবেতাই লেখক শ্যামচাঁদ বাবুকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়তিনি এই গ্রন্থ রচনায় যাঁদের সাহায্য পেয়েছেন, যাঁরা তাঁদের পরিশ্রম লব্ধ তথ্য দিয়ে শ্যামচাঁদ বাবুকে সাহায্য করেছেন, তাঁদের সকলকেও জানাই ধন্যবাদ ও অভিনন্দনআমি সকলের কল্যাণ কামনা করি।  27 জানুয়ারি 2021 



ড. চৈতন্য বিশ্বাস
রীডার এবং প্রধান অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, হীরালাল ভকত কলেজ, বীরভূম

Comments

Town Tarapith Rampurhat

আঞ্চলিকতাই আন্তর্জাতিক দর্পণ ।। ড. সুরঞ্জন মিদ্দে । 'রামপুরহাটের ইতিহাস' গ্রন্থটি আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার আদর্শ উদাহরণ।

গ্রন্থালোচনা : রামপুরহাটের ইতিহাস, দক্ষিণের কড়চায় প্রকাশ । ---সবকিছুরই খুঁটিনাটি রয়েছে বইতে। কাঞ্চিদেশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিকে এক কথায় রামপুরহাট পরিক্রমা বলা যেতে পারে।

শহর রামপুরহাট বীরভূমের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান ।। ড. বীরেশ্বর সিংহ ।। শ্যামচাঁদ বাগদি তার রামপুরহাটের ইতিহাস গ্রন্থে এই শহরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রিত করেছেন । এই গ্রন্থটি রামপুরহাটের সামগ্রিক বিষয়ে একমাত্র এবং প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ।

বীরভূম : ধন দেবী মহালক্ষ্মী

বাসন্তী দেবী এবং মহিষাসুর-বধ দেবী রূপ এক নয় । 'দুর্গা মহামায়া' প্রভাবেন । মহালয়া বিষয়ে তথ্যঋদ্ধ লেখাটি লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত সংস্কৃত শিক্ষক অনাথবন্ধু ভট্টাচার্য্য মহাশয় । । বাসন্তী পূজার উদ্ভবই মূল দুর্গোত্সব ।

আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার গুরুত্ব অপরিসীম ।। ড. অনিমেষ চট্টোপাধ্যায় । আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে শ্যামচাঁদ বাগদির রামপুরহাটের ইতিহাস এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন ।

মহারাজ নন্দকুমারের রাজবাড়ি ভদ্রপুর