বাসন্তী দেবী এবং মহিষাসুর-বধ দেবী রূপ এক নয় । 'দুর্গা মহামায়া' প্রভাবেন । মহালয়া বিষয়ে তথ্যঋদ্ধ লেখাটি লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত সংস্কৃত শিক্ষক অনাথবন্ধু ভট্টাচার্য্য মহাশয় । । বাসন্তী পূজার উদ্ভবই মূল দুর্গোত্সব ।

ঋতু বৈচিত্র্যে এবং বৈশিষ্ট্যে শরত্কাল অকাল বা অসময় নয় । শারদ প্রকৃতিতে সর্বত্রই পূর্ণতার রূপ পরিষ্ফুট । নদী জলাশয় জলপূর্ণ । সরোবরে পদ্ম ফুলের শোভা । শিউলীর সুবাস--- দূর হতে ভেসে আসে আগমনীর সুর । ঘাসের উপর শিশির বিন্দু যেন মুক্তো বিন্দু । শস্যভরা মাঠ এ যেন শারদলক্ষ্মীর সৌন্দর্য-- পরমাপ্রকৃতির রূপে বৈশিষ্ট্য । তাই বলা যায় মহীস্বরূপেন যতস্থিতাসি দেবীর বোধন হবে নব পত্রিকা রচনায়--
রম্ভা, কচ্চি, হরিদ্রা চ জযনিতী বিল্ব-দাড়িম্ব অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা
দেবী পরমা প্রকৃতি স্বরূপিনী মহালক্ষ্মী মহামায়া । ইনিই মহামায়া । অশুভ শক্তির বিনাশে শুভশক্তির ঘটবে উদ্বোধন সেই তো বোধন । মায়াময় এই জগত্-সংসার । মায়ার অমোঘ প্রভাবে এই জগতের সৃষ্টি-বৈচিত্র্য এমনই সুন্দর শোভার আধার । এই সুন্দর জগতের জীবসকল আনন্দিত এবং সবার উপভোগ্য এই সৃষ্টি । বেদান্তের মতে মায়াশক্তি সম্বলিত এই জগত প্রকৃতি ব্রহ্ম-সৃষ্ট তাই সত্য সম্ভুত । উপনিষদ এর এই কথাটি আনন্দাদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জাযন্তে অর্থাত্ এ জগতের সকলই আনন্দ থেকে জাত । বেদান্তের মায়ায় পরমার্থিক সত্তা স্বীকৃত হয়না । তন্ত্রেরমায়া অর্থাত্ মহামায়া সত্তারূপিনী ব্রহ্মময়ী
মহাসরস্বতী চিতে মহালক্ষ্মী সদাত্মকে মহাকাল্যনন্দরূপে তত্ত্বজ্ঞান সুসিদ্ধয়ে ।
মহামায়া বিশ্বব্যাপিনী হলেও নারী মূর্তিতেই তার প্রকাশ । শ্রীশ্রীমার্কণ্ডেয় চণ্ডীর নারায়ণী স্তুতিতে এই সত্যটি উক্ত আছে । তাই রূপভেদে মহাশক্তি---- দুর্গা, কালী, চামুণ্ডী সকল মহামায়ার রূপভেদ এরই প্রকাশ । শ্রীশ্রীচণ্ডীর প্রথম অধ্যায়ে মহামায়ার অমোঘ প্রভাব সম্বন্ধে যে একটি সাধারণ কাহিনী তথ্য স্থান পেয়েছে তাতে চৈত্র্যবংশ সম্ভুত রাজা সুরথ এবং সমাধি নামক বৈশ্য এর কথার উল্লেখ ঘটেছে দেবী মাহাত্ম্যে । রাজা সুরথ কোলা বিধ্বংসী যবনগণ কর্ত্তৃক আক্রান্ত ও পরাভূত হলে রাজ্যহারা সুরথ অরণ্য মধ্যে প্রবেশ করেন মৃগ শিকারের ছলে । সেই গভীর অরণ্য মধ্যে দেখতে পান মেধাঋষির আশ্রম, শান্ত সমাহিত এবং শিষ্যগণ পরিবেষ্টিত । ঘটনাচক্রে সমাধি নামক বৈশ্য সেখানে উপস্থিত হয় । রাজ্যহারা সুরথ তার দুর্দ্দশা ব্যক্ত করেন । বৈশ্য সমাধিও তার অসত্ পুত্রগণ এবং স্ত্রী কর্ত্তৃক প্রতারিত হন তথাপি তাদের জন্য চিন্তা করছেন----গভীর মমত্ববোধ সহ কল্যাণ কামনা প্রকাশও করছেন সেই সঙ্গে । অতঃপর তাঁরা উভয়েই মেধামুনীর আশ্রমে উপস্থিত হন, যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন এবং ভক্তিসহকারে । এই দুঃখ জনক বৃত্তান্ত শ্রবন করে মেধাঋষি উপদেশ ছলে বলেন----
তথাপি মমতা বর্তে মোহগর্তে নিপাতিতা মহামায়া প্রভাবেন সংসার স্থিতিকারিতা ।
অর্থাত্ --- সংসারের স্থিতিকারিনী মহামায়ার মায়ার প্রভাবে জীবগণ মোহরূপ গর্তে এবং মমতারূপ আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয় । মার্কণ্ডেয় পুরানের অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডীতে তাই বলা হয়েছে, দেবী অব্যক্ত শক্তি । এই দেবী হলেন জগত সংসারের মায়ারূপ---যে মায়ার কোন প্রত্যক্ষ রূপ নাই---সর্বত্রই তিনি অনুস্যূত । এই মহামায়াকে সন্তুষ্ট করার জন্য মেধস্ ঋষির নির্দেশে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দেবীর পূজা করেন । এই দেবী মূর্তি বাসন্তী দেবীর পূজিতা রূপ । বাসন্তী পূজার উদ্ভবই মূল দুর্গোত্সব । বর্তমানে বাসন্তী দেবী এবং মহিষাসুর বধ দেবী রূপ এক নয় । মহিষাসুর বধ এর কালে দেবী প্রকাশিতা হন দশভূজা দুর্গা রূপে । এটি মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গা-রূপ । শরত্কালে শারদীয়া দুর্গাপূজার বিধানকে অকালবোধন বলা হয় । এর অন্যতম কারণ রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য শরত্কালে দেবীর বোধন করেন, পৃথক প্রথা মতে । শারদীয়া দুর্গাপূজার দেবীর বোধনমন্ত্রে আছে---
রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ অকালে ব্রহ্মণাবোধো দেব্যাস্তয়ি কৃতপুরা । অহমপ্যাশ্বিনে তদ্বদবোধয়ামিসুরেশ্বরীম্ । ---বৃহন্নন্দিকেশব পুরাণোক্ত দুর্গাপূজাতত্ত্ব
শারদীয়া দুর্গা পূজার এই অকালবোধন তত্ত্ব দেবীভাগবত এবং কালিকা পুরানে পাওয়া যায় । বৃহদ্ধর্ম পুরান এ বর্ণনা করা হয়েছে রামচন্দ্রের প্রতি সানুগ্রহে ব্রহ্মা স্বয়ং রাবণ বধের জন্য় বোধন করেন । সৌর আশ্বিন মাসে জিতাষ্টমী পর্বের পর কৃষ্ণানবমী থেকে সুরু হয় পিতৃতর্পন । এই দিন শারদীয়া দুর্গাদেবীর বোধন ও কল্পারম্ভ । ভাদ্রমাসের অমাবস্যার অন্তে যদি আশ্বিনে দুটি অমাবস্যার অন্ত ঘটে তাহলে সেটি মহমাস রূপে গণ্য । এ বছর (1427) এমনই ঘটনা দেখা যায় । অবশ্য বর্ষাকাল মধ্যে যেকোন মাসে এমন ঘটে থাকলে মলমাস বলে গণ্য হয় । এবছর এজন্য নবম্যাদি কল্পারম্ভ এবং বোধন এই কারণেই হয়নি । তারপর মহালয়া অমাবস্যা তিথি যোগে তর্পন শেষ হয় পিতৃতর্পন । মহালয়া অর্থে সাধারণভাবে প্রকাশ পায় দেবীর আগমন এর জন্য যোগ্যআলয় রচনা । ভাদ্রমাসের অমাবস্যা কৌশী অমাবস্যা রূপে খ্যাত । দেবী পুরান মতে মহর্ষি কৌষিক এই তিথিযোগে যজ্ঞাগ্নিতেই অগ্নিময়ী রূপে দুর্গাপূজা করেন । সে সময়কালে মৃন্ময়ীদেবী মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল না । বর্তমানকালে মহাষ্টমী সন্ধিপূজায় পূজামন্ত্রে---কৌষিকী দেব্যৈ নমঃ মন্ত্রোচ্চারণ ঘটে থাকে । তৈত্তিরীয় আরণ্যক এ দেবী-রূপ জ্বলন্ত অগ্নি বর্ণা ।দেবতাগণ অসুরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে যখন ব্রহ্মার শরণ নেন ব্রহ্মা তখন দেবতাগণকে উপদেশ করেন মহাশক্তির আরাধনা করার৤ দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া সেই মহাশক্তি যিনি তার বিধান করতে সমর্থা । ব্রহ্মা তখন এক সমস্যার কথা প্রকাশ করেন । এই সমস্যাটি --- সূর্যের পরিক্রমা অনুযায়ী এখন দক্ষিণায়ন---এই দক্ষিণায়ন কাল দেবীর সুষুপ্ত থাকার কাল । দেবী এ সময় নিদ্রাভিভুত থাকেন সে কারণে এ সময় দেবীকে জাগ্রত করা অসম্ভব । দেবী মহামায়াকে জাগ্রত করার জন্য উপায়ান্তর না থাকায় ব্রহ্মা স্বয়ং তখন দেবী কৌমারীর স্তব করেন । দেবী কৌমারী স্তবে সন্তুষ্ট হন এবং দেবতাগণের প্রার্থনায় জাগ্রত হয়ে দেবতাদের বিল্ব-বৃক্ষ মূলে তেমনই বোধন করতে বলেন । তাহলে দেবী, রামচন্দ্রের বাসনা পূর্ণ করে রাবণ বধ সম্ভব করবেন । শারদীয়া দুর্গাদেবীর অকালবোধন এর এটিই তাত্পর্য্য । মার্কণ্ডেয় পুরাণান্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবীর মহিমা মহিষাসুরমর্দিনী রূপ এবং এই কাহিনীটি প্রাধান্য়লাভ করেছে । প্রথম মনু স্বায়ম্ভবের কালে মহিষাসুর ---ব্রহ্মার বরেই অমরত্বলাভ করে অত্যাচারী হয়ে ওঠে । তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের মুখমণ্ডল থেকে বিপুল তেজরাশি উদ্গত হতে থাকে । সকল দেবগণ স্ব-স্ব অস্ত্রে ভূষিত করলেন দেবী চণ্ডিকা রূপিনী মহাশক্তিকে । এই চরম লগ্নে দেবী বৈষ্ণবী রূপ থেকে বেরিয়ে উগ্রচণ্ডী রূপে প্রকটিত হলেন । মহিষাসুরকে বধ করার জন্য--- এটিই দেবী মহামায়া আদ্যাশক্তির দশভূজা মহিষমর্দিনী রূপ । শরত্কালে শারদীয়া দেবী দুর্গা এই রূপেই পূজিতা এবং আরাধিতা । দেবী দুর্গা মহালয়া অমাবস্যার পর শুক্লা সপ্তমীতে স্বয়ং রামচন্দ্রের অঙ্গে প্রবেশ করেন । অষ্টমী তিথিতে রাম রাবণের যুদ্ধ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে । অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে রামচন্দ্র রাবণ বধ করেন । দেবী প্রপন্নার্তি হরে প্রদীদ্.....

Comments

Town Tarapith Rampurhat

আঞ্চলিকতাই আন্তর্জাতিক দর্পণ ।। ড. সুরঞ্জন মিদ্দে । 'রামপুরহাটের ইতিহাস' গ্রন্থটি আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার আদর্শ উদাহরণ।

গ্রন্থালোচনা : রামপুরহাটের ইতিহাস, দক্ষিণের কড়চায় প্রকাশ । ---সবকিছুরই খুঁটিনাটি রয়েছে বইতে। কাঞ্চিদেশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিকে এক কথায় রামপুরহাট পরিক্রমা বলা যেতে পারে।

শহর রামপুরহাট বীরভূমের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান ।। ড. বীরেশ্বর সিংহ ।। শ্যামচাঁদ বাগদি তার রামপুরহাটের ইতিহাস গ্রন্থে এই শহরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রিত করেছেন । এই গ্রন্থটি রামপুরহাটের সামগ্রিক বিষয়ে একমাত্র এবং প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ।

বীরভূম : ধন দেবী মহালক্ষ্মী

আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার গুরুত্ব অপরিসীম ।। ড. অনিমেষ চট্টোপাধ্যায় । আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে শ্যামচাঁদ বাগদির রামপুরহাটের ইতিহাস এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন ।

মহারাজ নন্দকুমারের রাজবাড়ি ভদ্রপুর