বীরভূম শক্তি পীঠস্থান পর্যটনক্ষেত্র গুলিতে যানবাহন যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। বীরভূমে দেবী পীঠস্থানগুলি প্রায় সমস্তই কচ্ছপের পীঠের মতো উঁচু আকৃতি।

যুগ যুগ ধরে ধর্মপ্রাণ পল্লী অঞ্চলের মানুষজনের আগমনে বীরভূমের সমস্ত মন্দির প্রাঙ্গন পূর্ণ হয়ে ওঠে। শক্তিপীঠ মন্দিরগুলিতে ভক্তসমাগম ও দর্শনার্থীদের ভীড় দিনদিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বীরভূম জেলার পর্যটনক্ষেত্র গুলিতে যানবাহন যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে।  ট্রেন, বাস এর সংখ্যা অনেক সেসঙ্গে ছোট গাড়ি, অটো, টোটো সর্বত্রই সব সময় পাওয়া যাচ্ছে। বীরভূমে দর্শনীয় স্থানগুলিতে থাকার এবং আহারের সমস্ত রকম ব্যবস্থা আছে প্রচুর  লজ, গেস্টহাউস, হোটেল, রেস্তোরা।

বীরভূমের মাটি বায়ু প্রকৃতি নদ নদী অরণ্য যুগ যুগ ধরে মানুষকে আধ্যাত্মিক পথে চালিত করে আসছে।  মানুষকে আধ্যাত্মিক শক্তির পথে চালিত করে। 

বীরভূমে দেবী পীঠস্থানগুলি প্রায় সমস্তই কচ্ছপের পীঠের মতো উঁচু আকৃতি।  তন্ত্রসাধনা ছিল খুব গোপনে সাধন মার্গ।  আর এমনই চিহ্নিত স্থানই ছিল তন্ত্রসাধনার প্রকৃত স্থান।  


তারাপীঠ 

আলোকচিত্রী ঃ শ্যামচাঁদ বাগদি


রামপুরহাট শহর থেকে 9 কিমি দূরে প্রাচীন শক্তিপীঠ তারাপীঠ। উত্তরবাহী দ্বারকা নদের তীরে সাধক বামাক্ষ্যাপার সাধনক্ষেত্র তারাপীঠ। বীরভূমের তারাপীঠ মন্দির প্রসিদ্ধ পুরনো শক্তিতীর্থ স্থান। অতীতের বীরভূমে রত্নগড়ে জয়দত্ত নামে এক ধনি সদাগরের বাড়ি। এই জয়দত্ত বণিকই প্রথম তারাপীঠে দেবীমায়ের মন্দির তৈরি করেদেন। পরবর্তীকালে প্রাচীন বীরভূমের ঢেকার রাজা রামজীবন রায় তারামায়ের মন্দির সংস্কার করেন। বর্তমানে যে মন্দিরটি আমরা দেখি সেটি বীরভূমের মল্লারপুরের জগন্নাথ রায় মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন। পাশেই মহাশ্মশান।

আলোকচিত্রী ঃ শ্যামচাঁদ বাগদি



বীরভূমে তারাপীঠে সব চেয়ে বেশি হোটেল, রেস্তোরা, লজ, গেস্টহাউস আছে। তারাপীঠ মন্দির ভক্তদের ভীড়ে যেন প্রতিদিন তারাপীঠে মেলা। পূজার সামগ্রি সংগ্রহের জন্যে প্রচুর দোকান। এখান থেকেই মলুটীতে দেবী দর্শনে যেতে পারেন।


আকালীপুরে গুহ্যকালী 

আলোকচিত্রী ঃ শ্যামচাঁদ বাগদি


ভদ্রপুর আকালীপুরে কালী মন্দির। মন্দিরটি ব্রাহ্মণী নদীর পাড়ে। মহারাজ নন্দকুমার রায় এর আরাধিতা দেবী।  দেবী দ্বিভূজা, সর্পাসনা, সর্পাভরণা, কষ্টিক নির্মিত দেবী মূর্তি। শোনা যায় এই গুহ্যকালীমাতা মগধরাজ জরাসন্ধের পূজিতা। পরে কোনো বিশেষ সূত্রে কাশীরাজ চৈতসিং এই দেবীকে নিজ রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করেন।

বিদেশি ওয়ারেন-হেস্টিংস এর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে চৈতসিং গঙ্গার দশাশ্বমেধ ঘাটের জলে দেবীমূর্তিকে ডুবিয়ে রাখেন।  সেসময় দেবীর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে বাঙলার মহারাজা নন্দকুমার  গোপনে নৌকায় নিয়ে এলেন নিজের রাজ্যে। 

আলোকচিত্রী ঃ শ্যামচাঁদ বাগদি


সে সময় বীরভূমের প্রতিটি নদ-নদী জলপূর্ণ থাকতো। জলপথে নদীপথেই যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্য চালু ছিল। নন্দকুমার নৌকায় নিয়ে এলেন আকালীপুরের ঘাটে। ঘন জঙ্গালাকীর্ণ মন্দির পরিবেশে নন্দকুমার দেবীমাকে বেশ ধূমধাম করে 11ই মাঘ 1178 সনে প্রতিষ্ঠা করলেন। মন্দির অষ্টকোণাকৃতি। দেবীর বিশাললোচনা, বড় বড় চোখ, ত্রিনয়না কালিকা মূর্তি ভয়ের উদ্রেক কর। 

শারদীয় বিজয়ার পরে শুক্লা-চতুর্দশীতে এবং পৌষ মাসে সংক্রান্তি, মাঘে রটন্তী-চতুর্দশীতে দেবীর বিশেষ পূজা  মেলাও বসে। ভদ্রপুরে মহারাজা নন্দকুমার এর বাড়িটির কিছুমাত্র অবশিষ্ট রয়েছে। এগ্রামের ধারে রাণীসাগর ও গুরুসাগর নামে দুটি দীঘি। এই দীঘি দুটি নন্দকুমার খনন করিয়েছিলেন।  নাটোরের রাণী বহু একর জমি দেবোত্তর দান করেছেন।


বক্রেশ্বর দেবী 

বক্রেশ্বর দেবী শক্তিপীঠ রূপে পরিচিত, সেসঙ্গে এটি বহু পুরনো একটি শৈবতীর্থ স্থান। দেবী হচ্ছেন মহিষমর্দিনী। মন্দিরের উত্তরে অক্ষয় বট। মন্দিরের পূর্ব-উত্তরে বক্রেশ্বর নদ, দক্ষিণ দিকে পাপহরা। পাশেই মহাশ্মশান। মূল মন্দিরটি উড়িষ্যার রেখদেউল রীতিতে তৈরি। রাজনগরের ফৌজদার প্রচুর জমি দেবোত্তর দান করেছেন। শিবরাত্রিতে মেলা বসে। 

এখানে আটটি কুণ্ডু আছে। কুণ্ডুের প্রাকৃতিক প্রস্রবণ জল কোনটি উষ্ণ, কোনটি শীতল। প্রস্রবণের জলে প্রচুর পরিমাণে গন্ধক এবং ক্ষার ও খনিজ পদার্থ। অনেকেই বলে থাকেন উষ্ণ প্রস্রবণের জল অসুখের জীবাণু ধ্বংস করে। কুণ্ডুর জল পানীয় এবং ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহার হয়।


কঙ্কালীতলা 

বোলপুর থেকে মাত্র 9 কিমি দূরে কঙ্কালিতলা মন্দির।  দেবী মায়ের মন্দিরের উত্তর দিকে ক্রমশই উত্তরবাহী কোপাই নদী। মন্দিরের কাছেই পঞ্চবটী, মহাশ্মশান ও সাধুদের বাস। মন্দিরের ভেতরে দেবীর প্রতিমূর্তি অঙ্কিত। বর্তমান মন্দিরটি 1369 সালে 24 শে জৈষ্ঠ্য সাধক জগদীশবাবা কর্তৃক তৈরি করেন।

দেবী মন্দিরে প্রবেশপথে দেখতে পাবেন পঞ্চবটী বৃক্ষ। পঞ্চবটী বৃক্ষের পাশেই কাঞ্চিশ্বর শিব, রুরু ভৈরব মন্দির। চৈত্র সংক্রান্তিতে মেলা বসে। সাধক জগদীশ বাবার জন্ম তারাপীঠের কাছে পুরনো তারাপুর গ্রামে। সম্ভবত 1943 থেকে কঙ্কালীতলায় আসেন। এখানে প্রায় 15 থেকে 20 বছর তপস্বীজীবন কাটান। তাঁর সমাধি আছে তারাপীঠ তারাপুর গ্রামে।


ফুল্লরা 

কঙ্কালিতলা থেকে প্রায় 28 কিমি দূরে লাভপুরে মা ফুল্লরা মন্দির। বহু পুরনো শক্তিপীঠ। অতীতে এই দেবীপীঠস্থানে ঘন জঙ্গলেপূর্ণ ছিল। চতুষ্কোণ মন্দিরটি একটি টিলার উপরে অবস্থিত। এখানে দেবীদহে প্রচুর পদ্ম। এই পদ্মফুল ফুল্লরা মায়ের পূজায় নিবেদন করা হয়।  ফুল্লরা মায়ের মন্দিরের ঈশান কোণে শিবাভোগের স্থান। 

দেবী মায়ের ভোগ নিবেদন করার আগে শিবাভোগ দেওয়ার নিয়ম আছে। এক সময় জঙ্গলাকীর্ণ ফুল্লরা দেবীপীঠে শিবাভোগ গ্রহণ করতে দল বেঁধে শৃগাল শ্রেণীর বন্যপ্রাণীরা আসতো। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। মাঘ মাসে পূর্ণিমায় ফুল্লরা মায়ের মহামেলা। শারদীয়া পূজার পর ত্রয়োদশীতে মায়ের বিশেষ পূজা এবং মন্দির প্রাঙ্গনে বসে মেলা। 


নন্দিকেশ্বরী 

সাঁইথিয়ায় দেবী নন্দিকেশ্বরী মন্দির. সাঁইথিয়া রেলস্টেশনের কাছে দেবী নন্দিনী মন্দির। একটু দূরে ময়ূরাক্ষী নদী। এখান থেকে ঘুরে আসতে পারেন--- কোটাসুরে মদনেশ্বর শিব মন্দির, কল্লেশ্বরে কল্লেশ্বর শিব মন্দির।


ললাটেশ্বরী 

আলোকচিত্রী ঃ শ্যামচাঁদ বাগদি

নলহাটি শহরের পশ্চিম প্রান্তে নলাটেশ্বরী মন্দির।  দেবীর মন্দিরটি একটি টিলার পূর্ব দিকে অবস্থান করছে। টিলাটি দুবরাজপুরের পাহাড়টির সমসাময়িক। কিছু দূরে নাথপাহাড়, নাথযোগীদের সাধনক্ষেত্র।  নলহাটির টিলায় পার্বতী মন্দিরের কাছে একটি পাথরের গায়ে দুটি পায়ের চিহ্ন দেখা যায়। পদচিহ্ন দুটিকে অনেক ভক্তগণ শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজাদি করে থাকেন। এই টিলাতে বাঙলার নবাব আলিবর্দীর সময়ে বর্গীরা ঘাঁটি তৈরি করে। জনশ্রুতি আছে টিলায় একটি গড় ছিল, বর্গীরা গড়টি অধিকার করে। 

আলোকচিত্রী ঃ শ্যামচাঁদ বাগদি


ঊনবিংশ শতাব্দীতে এবং তার আগের শতাব্দীতে বীরভূম জেলা বেশ স্বাস্থ্যকর স্থান ছিল। সেসময়ে বহু দূর দেশ থেকে মানুষজন আসতেন বায়ু পরিবর্তনের জন্যে। এখানে এসেছেন এবং বেশ ভালো স্বাস্থ্য লাভ করে বাড়ি ফিরে গেছেন।

Comments

Town Tarapith Rampurhat

আঞ্চলিকতাই আন্তর্জাতিক দর্পণ ।। ড. সুরঞ্জন মিদ্দে । 'রামপুরহাটের ইতিহাস' গ্রন্থটি আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার আদর্শ উদাহরণ।

গ্রন্থালোচনা : রামপুরহাটের ইতিহাস, দক্ষিণের কড়চায় প্রকাশ । ---সবকিছুরই খুঁটিনাটি রয়েছে বইতে। কাঞ্চিদেশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিকে এক কথায় রামপুরহাট পরিক্রমা বলা যেতে পারে।

শহর রামপুরহাট বীরভূমের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান ।। ড. বীরেশ্বর সিংহ ।। শ্যামচাঁদ বাগদি তার রামপুরহাটের ইতিহাস গ্রন্থে এই শহরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রিত করেছেন । এই গ্রন্থটি রামপুরহাটের সামগ্রিক বিষয়ে একমাত্র এবং প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ।

বীরভূম : ধন দেবী মহালক্ষ্মী

বাসন্তী দেবী এবং মহিষাসুর-বধ দেবী রূপ এক নয় । 'দুর্গা মহামায়া' প্রভাবেন । মহালয়া বিষয়ে তথ্যঋদ্ধ লেখাটি লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত সংস্কৃত শিক্ষক অনাথবন্ধু ভট্টাচার্য্য মহাশয় । । বাসন্তী পূজার উদ্ভবই মূল দুর্গোত্সব ।

আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার গুরুত্ব অপরিসীম ।। ড. অনিমেষ চট্টোপাধ্যায় । আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে শ্যামচাঁদ বাগদির রামপুরহাটের ইতিহাস এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন ।

মহারাজ নন্দকুমারের রাজবাড়ি ভদ্রপুর